কোয়ারেন্টাইন কি? কোয়ারেন্টাইনে থাকা অবস্থায় কি কি করবেন?

কোয়ারেন্টাইন কি? কোয়ারেন্টাইনে থাকা অবস্থায় কি কি করবেন?

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে করোনা ভাইরাস , যা ইতিমধ্যে মহামারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সচরাচর কিছু উপসর্গ দেখা দেয় যার মধ্যে প্রধান হলো সাধারণ সর্দি,কাশি, জ্বর, গলা ব্যাথা। এই পর্যন্ত ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর ১৭৮ টি দেশে এবং মৃত্যুর সংখ্যা ৪ লক্ষ ছড়িয়েছে। এবং এই সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে।

যেহেতু এর কোনো প্রতিষেধক এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি, তাই এর থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো সতর্ক থাকা। আর প্রবাসী বা কারো মধ্যে এই রোগের উপসর্গ দেখা দিলেই ডাক্তাররা পরামর্শ দিচ্ছেন কোয়ারেন্টাইনে থাকার। আসুন জেনে নেই কোয়ারেন্টাইন কি এবং এই সময় কি কি করণীয়।

কোয়ারেন্টাইন কি?


কোয়ারেন্টাইন শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো- একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পৃথক বা আলাদা থাকা। তবে কোয়ারেন্টাইন অর্থ এই নয় যে, আপনাকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয়া হলো। যদি কারো করোনা ভাইরাসের উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে তাকে অন্যদের বা অনেক মানুষ আছে এমন এলাকা থেকে দূরে রাখতে এবং ভাইরাসটির সংক্রামণ ঠেকাতে অন্তত ১৪ দিন আলাদা থাকতে বলা হয়। মূলত কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে কোয়ারেন্টাইন মানে হলো বাড়িতে বা বদ্ধ ঘরে থেকে অথবা সম্পূর্ণ নিরাপদ স্থানে থেকে প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কোয়ারেন্টাইনে সর্বোচ্চ চার থেকে ছয়জনকে একসঙ্গে রাখা যায়। এর বেশি হলে সেটা আর কোয়ারেন্টাইন নয়। আলাদা করে সবাইকে রাখা হচ্ছে। নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা না হলে এ রোগ আরো ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বিশ্ব যেসব দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রামণ হয়েছে সেসব দেশের মানুষকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হচ্ছে। শুধু ইতালিতেই কোয়ারেন্টাইনে ১ কোটি ১৬ লাখ এর উপর মানুষকে রাখা হয়েছে, এর পর ও ইতালির মৃত্যুর মিছিল যেন থামছেই না, গড়ে প্রতি দুই মিনিটে একজন মারা যাচ্ছেন ইতালিতে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র্র মৃত্যুর মিছিলে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।

তবে কোয়ারেন্টাইনে থাকা মানে আপনাকে একদম গৃহবন্দী করে ফেলা নয়। চাইলে আপনার ফোন রাখতে পারবেন সাথে, এমনকি প্রতিনিয়ত ব্যবহার্য অন্যসব জিনিসপত্রও কেড়ে নেওয়া হবে না। সচরাচর করোনার উপস্থিতি ১৪ দিনের মধ্যে আক্রান্তের শরীরে পাওয়া যায়। যার জন্য এই ১৪ দিনে উপসর্গ পাওয়া রোগীর সংক্রমণ বাড়ে কিনা তা নিরীক্ষণ করা হয় আর এর জন্যই মূলত কোয়ারেন্টাইনে থাকা। করোনা ভাইরাস আস্তে আস্তে মানবদেহের কোষের সঙ্গে মেশে এবং এই আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙ্গে ফেলে। আর তাই এই সময় নিয়মিত সময়ে ব্যবধানে শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলা ও জ্বর কমাতে ওষুধ গ্রহণসহ ভালো স্বাস্থ্যবিধি অনুশীলন করানো হয়। করোনা আক্রান্ত রোগীদের ব্যবহার করা টাওয়াল, খাবারের পাত্র ও অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় ব্যবহৃত জিনিসগুলো দিয়েও ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই এগুলো আলাদা করে রাখা এবং সঠিক ভাবে ধৌত করা ও জরুরী। হোম কোয়ারেন্টাইন মানে আপনি থাকবেন নিজের বাড়িতে তবে সবার থেকে আলাদা দূরত্ব বজায় রেখে।

কোয়ারেন্টাইনে থাকা অবস্থায় কি কি করবেন?


  • ১। বাড়ির অন্য সদস্যদের থেকে আলাদা থাকুন। সম্ভব না হলে, অন্যদের থেকে অন্তত ১ মিটার দূরে থাকুন, ঘুমানোর জন্য পৃথক বিছানা ব্যবহার করুন।

  • ২। আলো বাতাসের সু-ব্যবস্থা সম্পন্ন আলাদা ঘরে থাকুন এবং অন্য সদস্যদের থেকে আলাদা থাকুন।

  • ৩। সম্ভব হলে আলাদা গোসলখানা এবং টয়লেট ব্যবহার করুন। সম্ভব না হলে, অন্যদের সাথে ব্যবহার করতে হয় এমন স্থানের সংখ্যা কমান ও ওই স্থানগুলোতে জানালা খুলে রেখে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা করুন।

  • ৪। বুকের দুধ খাওয়ান এমন মা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াবেন। শিশুর কাছে যাওয়ার সময় মাস্ক ব্যবহার করুন এবং ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিন।

  • ৫। আপনার সঙ্গে কোনো পশু-পাখি রাখবেন না।

  • ৬। বাড়ির অন্য সদস্যদের সঙ্গে একই ঘরে অবস্থান করলে, বিশেষ করে এক মিটারের মধ্যে আসার সময় মাস্ক ব্যবহার করা উচিত।

  • ৭। যদি কোন প্রয়োজনে বাড়ি থেকে বের হ্তে হয় তবে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করুন।

  • ৮। মাস্ক পরিধানরত অবস্থায় এটি কোন অবস্থাতেই হাত দিয়ে ধরা থেকে বিরত থাকুন। মাস্ক ব্যবহারের সময় সর্দি, থুতু, কাশি, বমি ইত্যাদি সংস্পর্শে আসলে সঙ্গে সঙ্গে মাস্ক খুলে ফেলুন এবং নতুন মাস্ক ব্যবহার করুন। মাস্ক একবার ব্যবহারের পর আবার ব্যবহার করার পূর্বে সাবান পানি দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিন।

  • ৯। টিস্যু পেপার ও মেডিকেল মাস্ক ব্যবহারের পর তা যত্রতত্র না ফেলে ঢাকনাযুক্ত বিনে ফেলুন।

  • ১০। ব্যক্তিগত ব্যবহার সামগ্রী অন্য কারও সঙ্গে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করবেন না।

  • ১১। আপনার খাওয়ার বাসনপত্র- থালা, গ্লাস, কাপ ইত্যাদি, তোয়ালে, বিছানার চাদর অন্য কারও সাথে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করবেন না। এসব জিনিসপত্র ব্যবহারের পর সাবান-পানি দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করে ফেলুন।

  • ১২। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আপনার কোয়ারেন্টাইন শেষ হবে। চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত মতে একজন হতে অন্যজনের কোয়ারেন্টাইনের সময়সীমা আলাদা হতে পারে। তবে, এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এ সময়সীমা ১৪ দিন। কোয়ারেন্টাইনেকালে সকলের সাথে ফোন, মোবাইল ও ইন্টারনেটের সাহায্যে যোগাযোগ রাখুন।

  • ১৩। শিশুকে তার জন্য প্রযোজ্য ভাবে বোঝান। তাদের পর্যাপ্ত খেলার সামগ্রী দিন এবং খেলনাগুলো খেলার পরে জীবাণুমুক্ত করুন।

  • ১৪। আপনার দৈনন্দিন রুটিন, যেমন- খাওয়া, হালকা ব্যায়াম ইত্যাদি মেনে চলুন।

  • ১৫। সম্ভব হলে বাসা থেকে অফিসের কাজ করুন।

  • ১৬। কোয়ারেন্টাইনে থাকা অবস্থায় যেকোনো বিনোদন মূলক কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করুন বা ব্যস্ত রাখুন। যেমন বইপড়া, গান শোনা, সিনেমা দেখা অথবা উপযুক্ত নিয়মগুলোর সাথে পরিপন্থী নয় এমন যেকোনো কিছু।

সর্বশেষ এবং সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোয়ারেন্টাইনে থাকার সময় করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কোনো উপসর্গ দেখা দিলে যেমন ১০০ ফারেনহাইট, ৩৮ সেলসিয়াস এর বেশি জ্বর, শুকনো কাশি, সর্দি, গলা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি অতি দ্রুত আইইডিসিআর-এর হটলাইন নম্বরে অবশ্যই যোগাযোগ করুন এবং পরবর্তী করণীয় জেনে নিন। তবে এসব উপসর্গ নিয়ে কোন অবস্থাতেই স্বশরীরে কোনো হাসপাতালে যাবেননা।

Comments
No comment yet