যে দিকগুলো প্রতিটা দম্পতির অনুসরণ করা উচিত

যে দিকগুলো প্রতিটা দম্পতির অনুসরণ করা উচিত

সুখী দাম্পত্য জীবন সকলেই চায়। কিন্তু চাইলেই তো আর জীবনে সুখ পাওয়া যায় না। সুখী দাম্পত্য জীবন পেতে গেলে তার কতগুলি শর্ত মেনে চলতে হয়। এই শর্তগুলি মানলেই জীবন হয়ে ওঠে আনন্দময়।

বিবাহিত জীবনের সবচাইতে বড় সম্বল হচ্ছে ম্যাচিউরিটি। দাম্পত্যে ম্যাচিউর আচরণ আপনাকে যা দিতে পারবে, অন্য কিছুই তা পারবে না। পরিবারের সকলকে বোঝার চেষ্টা করুন, ক্ষমা করতে শিখুন, দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক রক্ষার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করুন। কোথায় আপনাকে কী করতে হবে, সহজেই বুঝে যাবেন। মনে রাখবেন, আনন্দ বিনিময় করা খুব সহজ। কেবল চাই একটুখানি চেষ্টা।

দাম্পত্য সহজ, এমনটা কেউ বলেনি। তবে খুব একটা কঠিন কিছুও নয়। চেষ্টা করুন, সহজেই অর্জন করতে পারবেন সকলের ভালোবাসা।

একে অপরকে চিনুন

বিয়ের ক্ষেত্রে একে ওপরকে চেনাটা খুবই জরুরি। মতানৈক্য হতেই পারে। দুজন আলাদা মানুষ, তাদের আলাদা চিন্তা ভাবনা হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার জেরে যদি বাড়িতে কাক আর চিল বসতে না পারে তাহলে কিছুই করার নেই। তাই এক অপরের কথা শুনুন এবং পরে মাথা ঠান্ডা হলে অপরকে বুঝিয়ে বলুন, দেখবেন ঝামেলা মিটে যাবে।

ক্ষমা করতে শিখুন

ভুল মানুষ মাত্রই হয়ে থাকে। তবে সেই ভুলটাকে ধরে বসে থাকবেন না। মাথা ঠান্ডা করে স্বামী অথবা স্ত্রীকে ভুলটা ধরিয়ে দিন। তারপর তাকে ক্ষমা করে দিন। ক্ষমা করার ওপরে কোনও কথাই থাকতে পারে না। ক্ষমা করার পর এই ভুল নিয়ে আর কখনওই কোনও কথা বলবেন না। ভুলের কথা সম্পূর্ণভাবে ভুলে যান।

রাগকে সঙ্গে করে বিছানায় যাবেন না

মাথা গরম তো সকলেরই হয়। কিন্তু তা বলে এক মুখ রাগ নিয়ে বিছানায় গেলে কখনওই দাম্পত্য আর সুখীর আখ্যা পাবে না। তাই বিছানায় যাওয়ার আগেই নিজের রাগকে থিতু করে তবেই বিছানায় যান।

চুপ করে থাকতে শিখুন

চুপ করে থাকা একটা বড় কাজ। বিবাহিত জীবনে মাঝে মধ্যে চুপ করে থাকলে কিছুই যায় আসে না। তাই একজন বেশি কথা বললে নিজে একটু চুপ করে থেকেই দেখুন না কি হয়!

সদা আনন্দে থাকুন

নিজের বাবা-মাকে এতো দিন রাগ দেখিয়েছেন বলেই যে বউ অথবা স্বামীর ওপরেও রাগ দেখাবেন সব সময় তা কখনওই নয়। ঝগড়া করার সময় ঝগড়া করার পর মিটিয়ে নিয়ে, বেশিরভাগ সময়ই মুখে একটা প্লাস্টিক হাসি লাগিয়ে রাখুন দেখবেন দাম্পত্য জীবনের চাকা গড়গড়িয়ে ঘুরবে।

অফিসের কাজ কখনওই বাড়িতে নয়

অফিসের কাজ কখনওই বাড়িতে করবেন না। অফিসের যাবতীয় চিন্তা ভাবনা এবং ফেলে আসবেন অফিসের মধ্যেই। তাকে সঙ্গে করে বাড়িতে নিয়ে এসে নিজের কাছের মানুষদের ওপর রোজ ওই রাগ দেখালে আর দাম্পত্য জীবন টিঁকবে না।

সব সময় বন্ধুত্ব রাখুন

বিয়ে করেই টিপিক্যাল স্বামী-স্ত্রীতে পরিণত হয়ে যাবেন না। দেখবেন দুজনের মধ্যে যেন বন্ধুত্বটি বর্তমান থাকে। বন্ধুত্ব থাকলেই আর কোনও অসুবিধা হবে না।

দায়িত্ব নিতে শিখুন

বিয়ে করেছেন ঘরে মাকে সাহায্য করার জন্য বউ এনে দিয়েছেন বলেই সমস্ত দায়িত্ব নিজের গা থেকে ঝেড়ে ফেলবেন না। সব সময় পরিবারের সকলের দায়িত্ব নিজের। অফিসে কাজের দোহাই দিয়ে ইলেক্ট্রিকের বিল বা ব্যাঙ্কের কাজ এড়িয়ে তা কখনওই বউয়ের ওপর চাপিয়ে দেবেন না।

নিজের জীবন সাথীর সব থেকে বড় চিয়ারলিডার হন

যে কোনও খারাপ সময়ের জন্য নিজের জীবনসাথীকে কখনওই দায়ী করবেন না। যদিও আপনি জানেন তিনিই দায়ি। সেই খারাপ সময় তাঁর পাশে দাঁড়ান। তাঁর সব থেকে বড় শক্তি হয়ে উঠুন। যখন সারা দুনিয়া আপনার সাথীর অপরদিকে চলে যাবে তখনও তার হাতটাকে শক্ত করে ধরে থাকুন। দেখবেন কোনও দিন টলমল করবে না সম্পর্কের সেতু।

সারপ্রাইজ দিন

বিয়ের বহু বছর পরেও যাতে প্রেম আপনাদের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে না তার জন্য একে ওপরকে সারপ্রাইজ দিন। দেখবেন এই সারপ্রাইজের মাধ্যমেই আপনাদের মধ্যেকার প্রেম নতুন ভাবে জেগে উঠবে।

কিছু শিক্ষণীয় বিষয়

১। কারো ব্যক্তিগত দাম্পত্য জীবনে নাক গলাবেন না। যেচে পড়ে উপদেশ দিতে যাবেন না। কেবল তখনই কথা বলুন, যখন অন্য পক্ষ সেটা শুনতে চায়।

২। নিজেকে শান্ত রাখতে শিখুন। নিজের পরিবারেও অনেক কিছু আমাদের পছন্দ হয় না। সেখানে শ্বশুরবাড়ির সবকিছু বা সবাইকে আপনার ভালো লাগবে, এমনটা ভাবা অনুচিত। নিজেকে শান্ত রাখতে শিখুন। নতুন সবকিছুকেই খারাপ মনে না করে কিছুদিন চেষ্টা করেই দেখুন ভালো লাগে কিনা।

৩। সবকিছুর ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলবেন না। ভনিতা করে বা অভিনয় করে ভালোবাসা পাওয়া যায় না। হয়তো আপনার শ্বশুর-শাশুড়ি যেমন পছন্দ করেন, আপনি তেমন নন। কিন্তু তাই বলে নিজেকে তাঁদের পছন্দ অনুযায়ী করার চেষ্টা করে লাভ নেই। আপনি যেমন আছেন, সেভাবেই তাঁদের মন জয় করার চেষ্টা করুন। নিজেকে বদলে ফেলে কিছুই পাবেন নাশ।

৪। বয়সে বড় সকলের জন্যেই সম্মান ও ছোটদের জন্যে স্নেহ বরাদ্দ রাখুন। হয়তো মনে মনে আপনি মানুষটিকে পছন্দ করেন না। কিন্তু যেহেতু তারা আত্মীয়, সম্মান ও স্নেহ তাঁদের প্রাপ্য। তাঁদের থেকে গা বাঁচিয়ে চলুন, অসুবিধে নেই। কিন্তু কখনো অসম্মান বা অনাদর করবেন না।

৫। কিছু ব্যাপার আগেই নির্ধারণ করে রাখুন। সম্পর্কের সীমারেখা থাকা জরুরী, তাই স্বামী-স্ত্রী মিলে ঠিক করুন ব্যাপারগুলো। যেমন- শ্বশুরবাড়িতে কী দেবেন আর কীভাবে, উত্‍সব-অনুষ্ঠানে কী হবে, কোন ব্যাপারগুলোতে আপনারা কথা বলবেন আর কোনগুলো এড়িয়ে যাবেন ইত্যাদি।

৬। সঙ্গীর সাহায্য নিন, তাঁর কাছ থেকে জেনে নিন কেমন আচরণে পরিবার বিব্রতবোধ করে। সকলের পছন্দ-অপছন্দ জানুন, সকলের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য জেনে রাখুন। এতে আপনার জন্যে সহজ হবে। আজীবন কাজে আসবে তথ্যগুলো।

৭। স্বামীসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে কিছু সময় ব্যয় করতে হবে। হুট করেই তো ভরসা তৈরি হবে না। তাই ধীরে ধীরে আপনাকে বোঝার সুযোগ করে দিতে হবে । যেমন গল্প করা, তাদের সাথে টিভি দেখা, মাঝে মাঝে কেনাকাটা করতে যাওয়া, ছোটদের সাথে ভালো ব্যবহার করা। অন্তত এগুলোর মাধ্যমে আপনি অনায়াসে মিশে যেতে পারবেন নতুন পরিবারটিতে। মাঝে মাঝে পরিবারের সবার জন্য নিজের পছন্দমতো কিছু কেনাকাটা করে উপহারও দিতে পারেন। উপহার যে খুব দামী হতে হবে তা কিন্তু নয়। হতে পারে সদস্যদের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোই। এতে করে সবাই খুশিও হবে, আর আপনারও ভালো লাগবে।

এভাবে ধীরে ধীরে আপনি কখন যে পরিবারের অন্যতম একজন হয়ে উঠবেন নিজেই বুঝতে পারবেন না। ফলে পরিবারের সবাই আপনাকে সম্মানের চোখেই দেখতে শুরু করবে। আপনি যেমনভাবে নতুন পরিবারটিকে নিজের মতো করে নিবেন ঠিক তেমনি আপনার স্বামীকেও আপনার পরিবারের উপর কিছু দায়িত্ব কর্তব্য পালন করা উচিত।

বলা হয়, ঝগড়া ও ভালোবাসা পরস্পর মিশে থাকে। পরিবারে টুকটাক সমস্যা হতেই পারে। এমন অবস্থায় শ্বশুর বাড়ির বদনাম নিজের বাপের বাড়ির কাছে করা থেকে বিরত থাকুন। এমনকি কোনো ধরনের মন্তব্যও না। এতে না করলে আপনার দুই পরিবারেই ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা হতে পারে। আবার পরিবারে কোনো সমস্যা হলে আপনি সরাসরি কিছু না বলে শ্বশুর বাড়ির বয়ষ্কদের সাথে আলাপচারিতার মাধ্যমে মিটিয়ে নিতে পারেন। আবার যে ক্ষেত্রে অন্যদের রাখা সম্ভব না, সেখানে আপনার স্বামীর সাথে আলোচনা করতে পারেন। এতে করে পরিবারের মধ্যে কোন ভুল বোঝাবুঝি হবে না । আপনাকে মনে রাখতে হবে দুটি পরিবারের সম্মানই আপনার হাতে।

একসাথে থাকতে গেলে অনেক মেয়েলি খুঁনসুটি হয়, এমনকি মায়ের সাথেও মেয়ের ঝগড়া হয়। কিন্তু অন্তত শ্বশুর বাড়ির ক্ষেত্রে এরকম হলে কারো সাথে কথা কাটকাটি করতে যাবেন না। প্রয়োজনে তাকে পরে বুঝিয়ে বলুন। ছাড়ের ক্ষেত্রে আপনিই এগিয়ে আসার চেষ্টা করুন। কারণ কিছুটা ছাড় আর ধৈর্য্য দিয়েই সংসারের হাল ধরে রাখতে হয়। আর তাতেই সংসার হয়ে ওঠে আনন্দের জায়গা।

শেষ কথা

টাকা-পয়সা, সৌন্দর্য বিবাহিত জীবনকে সুখী করতে পারে না। অন্তত একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। তাঁর মতে, একটি ভালোবাসাময় সুখী বৈবাহিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য সবার মধ্যে যে গুণটি থাকা প্রয়োজন, তা হলো—আন্তরিকতা। আন্তরিক বলতে তিনি এমন কাউকে বুঝিয়েছেন, যিনি হবেন বিনীত, নমনীয়, বিশ্বাসযোগ্য, ভালো স্বভাব, সহযোগী মনোভাবাপন্ন, ক্ষমাশীল, উদার ও ধৈর্যশীল।

ভালোবাসাই একজন নারী ও একজন পুরুষের মাঝে হূদয়ের অটুট বন্ধন তৈরি করে দেয়। তৈরি করে সাংসারিক বন্ধন। ভালোবাসা ব্যতীত কোনো সাংসারিক কিংবা দাম্পত্য জীবন সুখের হয় না। স্বামী ও স্ত্রী একে অন্যের পরিপূরক। একজনকে বাদ দিয়ে অন্যজন শূন্য, ফাঁকা।

একজন সুন্দর মনের ও সুন্দর গুণের স্ত্রী সংসারকে তাঁর নিজের আলোয় আলোকিত করে তুলতে পারেন। সাজিয়ে তুলতে পারেন সংসার জীবনকে সুখের স্বর্গীয় বাগানের মতো করে। তবে এই কাজের জন্য দরকার প্রেমিক স্বামীর স্ত্রীর প্রতি ঐকান্তিক মায়া-মমতা ও সুগভীর ভালোবাসা। এই ভালোবাসা থাকলে দেখবেন, বিবাহিত জীবনে সুখ কাকে বলে!

Comments
No comment yet