সবাইকে নিয়ে সাধারণভাবে বিয়ের সুন্দর প্রস্তুতি

সবাইকে নিয়ে সাধারণভাবে বিয়ের সুন্দর প্রস্তুতি

বর্তমানে বাংলাদেশে শহুরে বিয়ের অনুষ্ঠান যেন মানুষের মর্যাদার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ৷ বিয়েতে কে কত বেশি জমকালো আয়োজন করতে পারে, অর্থ ব্যয় করতে পারে, তার যেন প্রতিযোগিতা চলে আজকাল ৷ কিন্তু এর প্রয়োজন আসলে কতটা ?

মূল কথায় যাওয়ার আগে আসুন আজ থেকে এক বা দুই দশক পিছিয়ে যাই৷ ৮০ বা ৯০-এর দশকে বাংলাদেশে মুসলিম বা হিন্দু বিবাহ ছিল আজকের অনুষ্ঠান থেকে অনেকটাই ভিন্ন ৷ সেসময় বিয়েতে প্রধান অতিথি হতেন আত্মীয়স্বজন, এরপর পাড়া-প্রতিবেশী ও বন্ধু-বান্ধব ৷ নিজেদের বাড়িতেই হতো অনুষ্ঠান৷ ঢক যাঁরা ভাড়া বাসায় থাকতেন, তাঁদের বিয়ে হতো আত্মীয় বা প্রতিবেশীর বাসায়, যাঁদের ছাদ আছে বা আছে বড় উঠোন৷ মুসলিম বিয়েতে হলুদ থেকেই শুরু হতো বিয়ের অনুষ্ঠান৷ আজকের মতো উপটান দিয়ে হলুদ তখন দেয়া হতো না ৷ রীতি মতো কাঁচা হলুদ বাঁটা হতো, সঙ্গে হত গীত – ‘‘হলুদ বাটো, মেহেদি বাটো...''৷ একদিকে গান চলছে, অন্যদিকে কাঁচা হলুদ ও মেহেদি পাতা বাটা হচ্ছে ৷ চারপাশে হাসির ফোয়ারা, সেইসাথে আনন্দের লহর ৷ আর হলুদে হতো রং খেলা ৷ একে অপরকে রাঙিয়ে আনন্দ হতো দ্বিগুণ ৷

এরপর ছাদে বা পাশের বড় কোনো মাঠে সামিয়ানা টাঙিয়ে বিয়ের দিন হতো প্রীতিভোজ ৷ উপহার দেয়া হতো নব দম্পতির সাংসারিক জীবনে যা প্রয়োজন, তেমন আসবাব ৷ কনের প্রসাধনও ছিল সাধারণ৷ হলুদে গাছ থেকে ফুল ছিড়ে তা দিয়ে সাজ ৷ সাধারণ সুতি বা জামদানি শাড়ি৷ বিয়ের দিন বেনারশি শাড়ি, একটু স্নো পাউডার, চোখে কাজল ৷ আত্মীয় বা প্রতিবেশীদের মধ্যে যে ভালো সাজাতে জানেন, তাঁর ওপরই পড়ত কনেকে সাজানোর ভার ৷ বিয়েতে এই যে আত্মীয়-প্রতিবেশীদের সমাগম, তাঁরা কিন্তু নিজেরাই কাজ ভাগ করে নিতেন ৷

এমনকি কোমরে গামছা বেঁধে তাঁরা নেমে পড়তেন খাওয়ার পরিবেশনের কাজও৷ ফলে যে পরিবারে মেয়ের বিয়ে তাঁদের ওপর চাপ অনেক কমে যেত ৷ বিয়েতে অর্থ খরচের বাহুল্যো তেমন চোখে পড়ত না ৷ অথচ আনন্দের কোনো কমতি ছিল না ৷ প্রতিটির মেয়েরই জীবনে সাধ থাকে বিয়ের দিনটিতে তাঁকে যেন রাজরানীর মতো লাগে ৷ তখনকার সেই সাজে মেয়েটি কিন্তু তৃপ্ত ছিল ৷ তাঁর স্বপ্ন ভঙ্গ হতো না ৷

কিন্তু গত দই দশকে বদলে গেল চিত্র ৷ বাংলাদেশের শহরগুলোতে গড়ে উঠল অনেক ভবন ৷ গড়ে উঠল অ্যাপার্টমেন্ট৷ আগের মতো জায়গা পাওয়া না যাওয়ায় অনেকেই বাধ্য হলো কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া নিতে ৷ সেটা অবশ্য হতেই পারে ৷ কিন্তু সমস্যা হলো অন্য জায়গায় ৷ হিন্দি সিরিয়াল ও বলিউডের প্রভাবে অনেক উচ্চবিত্তরা শুরু করলেন নতুন এক সংস্কৃতি৷ হলদি নাইট, মেহেন্দি নাইট শুরু হয়ে গেল ৷ ডিজে আনা হতে লাগলো৷ প্রচুর খরচ হতে শুরু হলো বিয়েতে ৷ কে কার চেয়ে বেশি পারে ৷

হিন্দু বিয়েতেও একই অবস্থা ৷ আগে হিন্দু বিয়েতে হলুদ দিয়ে মেয়েকে গোসল করানো হতো ৷ এখন হলুদে আলাদা অনুষ্ঠান হয়, মেহেদি পড়ানো হয় ৷ আর পার্লারে যাওয়া যেন বাধ্যতামূলক ৷ কেবল কনে নয়, বর এবং দুই পরিবারের আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবাই ৷ তার ওপর হলুদে হিন্দি গানের সাথে রাতভর নাচ তো আছেই ৷ ডিজিটাল অগ্রগতির কারণে এই সংস্কৃতি কেবল শহরে নয়, এখন ছড়িয়ে যাচ্ছে গ্রামেও ৷

প্রশ্ন হলো, এতে করে কি আনন্দের মাত্রা আগের চেয়ে বেড়েছে ? আমার তো মনে হয় না ৷ কেননা বর্তমানে আমন্ত্রিত অনেককেই হয়ত বর-কনে চেনেন না ৷ তাছাড়া এত অর্থ ব্যয়ের প্রতিযোগিতায় অনেক বাবা-মা নিঃস্ব হয়ে যান ৷ নিজের কন্যা বা পুত্রের মুখের দিকে চেয়ে তারা, মানে তাঁদের বুকের ধন যা দাবি করে – তাই উজার করে দিতে চান তাঁরা৷ কিন্তু এর কোনো প্রয়োজন আছে কি ?

নিজের পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ছোট করে চমৎকার একটি বিয়ের আয়োজন কি কারো মর্যাদা বা আভিজাত্যে আঘাত হানে ? কত গরু-খাসি কাটা হলো, কত মানুষ আমন্ত্রিত হলো, বিয়ের পর সে হিসাব কে রাখে ? বরং কাছের ও পছন্দের মানুষের আশীর্বাদটাই যে সবচেয়ে প্রয়োজন ৷ আর বাবা-মা যদি সত্যিই ধনী হন, তবে তো জীবনের এই বিশেষ মুহূর্তটাকে আরও স্মরণীয় করে রাখা যায় আরও বড়, আরও ভালো কাজের মধ্য দিয়ে !

সমাজের মধ্যে সকলকে নিয়ে আনন্দ উদযাপন করলে এতে কোন কমতি হয় না বরং আনন্দ অনেকগুণ বেড়ে যায়। বাবা-মা কে খুশি রেখে নিজেদের মাঝে বিয়ের খুশি ভাগ করে নতুন ধাপে পা দিলে জীবন ও অনেক সুন্দর হয় কেননা বড়দের দোয়া এবং মনের প্রশান্তি ও আমাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ। আর গরীবদেরও বিয়েতে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ দিন এতে তারা ও জীবনকে উপভোগ করার একটি কারণ পাবে শুধু আপনার জন্যই।

Comments
No comment yet