বিয়ে নিয়ে আমাদের দেশের মানুষের গতানুগতিক চিন্তাধারা

বিয়ে নিয়ে আমাদের দেশের মানুষের গতানুগতিক চিন্তাধারা

বিয়ে জীবনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে বিয়ে অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে। এটি একটি নয় বরং অনেকগুল বিষয়ের সাথে জড়িত। নিজের ক্যারিয়ার আর পরিবারের অনেক ইচ্ছে পূরণের মধ্য দিয়ে সব ঠিক ভাবে সামলানো মাঝে মাঝে অনেকের কাছে খুব কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ভেবে চিন্তে এই সিদ্ধান্তে যেতে হয় যা অনেক সময় নানা সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সমস্যার নানা দিক

বাংলাদেশের বাইরে গেলে বিশেষ করে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে বাঙালি সমাজের যে জিনিসটা আমার চোখে পড়ে, সেটা হচ্ছে অসম বিয়ে। বিষয়টি নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে যা বুঝলাম তা হচ্ছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ছেলে বা মেয়েকে বিদেশে বিয়ে দেওয়ার জন্য, একটু ভালো থাকার জন্য, ভালো শিক্ষা ও উন্নত জীবনের জন্য অভিভাবকেরা এটা করে থাকেন।

সেখানে ছেলে বা মেয়ের মতামতকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় বলে মনে হয় না। আবার এও দেখা যায় যে, ছেলে বা মেয়েও মনে করে বিদেশ চলে গেলেই হয়তো জীবনের মোড় ঘুরে যাবে। এ ধরনের বিয়ের ক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে পাত্র-পাত্রীর অসম বয়স। পাত্রের বয়স হয়তো ৪০/৪৫, মেয়ের বয়স ২০/২১ বছর।

বয়সের এই ব্যবধান বিয়ের প্রথম থেকেই স্বামী-স্ত্রীর মনে একটা দূরত্ব সৃষ্টি করে। স্বামীর বয়স বেশি হলে, সে তার স্ত্রীর প্রতি কর্তৃত্ব বা অভিভাবকত্ব অনুভব করে, যা আমাদের বাঙালি সমাজ-সৃষ্ট। স্বামী নির্ধারণ করে দেয় স্ত্রীকে কী করতে হবে, কী পোশাক পরতে হবে, কোথায় কার সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। আজ পর্যন্ত এমন কোনো বাঙালি দম্পতি আমার চোখে পড়েনি, যার স্বামীর চেয়ে স্ত্রী ১০/১৫ বছরের বড়; কিন্তু উল্টোটা হরহামেশাই দেখা যায়। উন্নত বিশ্বে যদিও বিয়ে বা প্রেমের ক্ষেত্রে বয়স কোনো বিষয় নয়। দ্বিতীয়ত, যেটা চোখে পড়ে, সেটা হচ্ছে অসম সামাজিক পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা।

মনে করুন, একটা ছেলে বা মেয়ের জন্ম হয়েছে লন্ডন বা নিউইয়র্কে, বেড়ে উঠেছে এখানকার পরিবেশে। তার চিন্তা, চেতনা, গড়ন, মনন সবকিছুতেই থাকবে এখানকার ছাপ । কিন্তু তার অভিভাবকের ইচ্ছে তাকে বাংলাদেশে বিয়ে করাতে হবে। অনেক সময় অভিভাবকের ইচ্ছায় কোনো কোনো ছেলে বা মেয়ে সেরকম বিয়ে করে। কিন্তু এখানে আসার পরই দেখা দেয় বিভিন্ন সমস্যা, যা খুবই স্বাভাবিক। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে চিন্তার অমিল, একে অন্যকে বুঝতে সমস্যা—এসব বিষয় নিয়ে পরস্পরের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। ফলে দেখা দেয় নানান সমস্যা। এরপর হচ্ছে অসম শিক্ষা। ছেলে বিদেশ থাকে। ঝটিকা সফরে বিয়ে করতে যায় দেশে। চলনে-বলনে, কথাবার্তায় খুবই স্মার্ট, ভালো চাকরিও করে। তার বাচনভঙ্গি, পোশাক-আশাকে মুগ্ধ হয়ে অনেক সময় ঘটকের পাল্লায় পড়ে অভিভাবকেরা তড়িঘড়ি উচ্চশিক্ষিত মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেন। কিন্তু মেয়ে বিদেশে আসার পর দেখা দেয় সমস্যা।

মেয়ে খুব অল্প সময়েই বুঝতে পারে যে, ছেলের একাডেমিক কোনো শিক্ষা নেই। একে অপরকে বুঝতে অসুবিধা হয় তখন। ফলে দেখা দেয় বিভিন্ন সমস্যা। সেটা ছেলেদের ক্ষেত্রেও হয়। তাই বিদেশি ছেলে বা মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার আগে উচিত তার ব্যাপারে খোঁজ খবর নেওয়া। কোন কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছে, তার ক্লাসমেট কে ছিল, কোন বিষয়ে কত সালে গ্র্যাজুয়েশন করেছে ইত্যাদি সম্পর্কে ভালোভাবে জানা দরকার। প্রয়োজনে সার্টিফিকেট দেখে নেওয়া যেতে পারে। তার বন্ধুবান্ধব, কাজের খোঁজ নেওয়াও জরুরি। এতে করে কোনো ভুল তথ্য দিলে, তা বিয়ের আগেই ধরা পড়ে। ফলে বিয়ের পরবর্তী সমস্যাগুলো আর হয় না। এখন তো মুক্ত প্রযুক্তির বদৌলতে খুব অল্প সময়েই অনেক কিছু বের করে নেওয়া যায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব

ইদানীং নতুন আরেকটা সমস্যা দেখা দিয়েছে সেটা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেলে মেয়েদের যোগাযোগ এবং বিয়ে। এতে ছেলে মেয়েদের একের সঙ্গে অন্যের যোগাযোগ হয়। উভয়েই তাদের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে এবং দেখে। যদি সেটা স্বল্প সময়ের মধ্যে পরিণতির দিকে যায়, তাহলে পরে দেখা দেয় নানান সমস্যা। যেমন একে অন্যকে দেওয়া তথ্য, বিশেষ করে বয়স, চাকরি, শিক্ষা, সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি যখন দেখা যায় বাস্তবের সঙ্গে মিলছে না, তখনই দেখা দেয় সমস্যা। অন্যদিকে একে অপরের সঙ্গে যদি মেলামেশা করে তথ্য আদান প্রদান করে, একে অপরকে বুঝতে পারে তবে সমস্যা হয় না।

শেষ কথা

বিবাহিত জীবনের সবচাইতে বড় সম্বল হচ্ছে ম্যাচিউরিটি। দাম্পত্যে ম্যাচিউর আচরণ আপনাকে যা দিতে পারবে, অন্য কিছুই তা পারবে না। পরিবারের সকলকে বোঝার চেষ্টা করুন, ক্ষমা করতে শিখুন, দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক রক্ষার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করুন। কোথায় আপনাকে কী করতে হবে, সহজেই বুঝে যাবেন। মনে রাখবেন, আনন্দ বিনিময় করা খুব সহজ। কেবল চাই একটুখানি চেষ্টা।

দাম্পত্য সহজ, এমনটা কেউ বলেনি। তবে খুব একটা কঠিন কিছুও নয়। চেষ্টা করুন, সহজেই অর্জন করতে পারবেন সকলের ভালোবাসা।

Comments
No comment yet